ঢাকা , শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬ , ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রতিদিন ১ ঘণ্টা ‘অতিরিক্ত কাজ’ করবেন পল্লী বিদ্যুতের ৪৬ হাজার কর্মী

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ১৩-০৬-২০২৬ ০৩:৩২:৪৯ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১৩-০৬-২০২৬ ০৩:৩২:৪৯ অপরাহ্ন
প্রতিদিন ১ ঘণ্টা ‘অতিরিক্ত কাজ’ করবেন পল্লী বিদ্যুতের ৪৬ হাজার কর্মী ফাইল ছবি
দাবি-দাওয়া আদায়ে কর্মবিরতি, ধর্মঘট কিংবা কাজ কমিয়ে দিয়ে কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টির ঘটনা দেশে নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র। পুরনো সেই চেনা ছক ভেঙে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ও অভিনব এক প্রতিবাদ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পবিস) কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও বঞ্চনার প্রতিবাদে তারা কোনো কর্মবিরতি করছেন না, উল্টো প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে ‘অতিরিক্ত কাজ’ করার ঘোষণা দিয়েছেন।

আগামীকাল রবিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া এই অভিনব কর্মসূচিতে অংশ নেবেন দেশের ৮০টি সমিতির প্রায় ৪৬ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। যা চলবে ৩০ জুন পর্যন্ত। একই সঙ্গে সরকারের চলমান জ্বালানি সাশ্রয় কর্মসূচির প্রতি সংহতি প্রকাশ, গ্রাহকসেবা নিশ্চিতকরণ ও রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনের (বাপবিএ) ভার্চুয়াল সভায় গত ১১ জুন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই কর্মসূচির মাধ্যমে দেশ ও জাতীয় সেবায় মোট ৭ লাখ ৮২ হাজার অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা যুক্ত হবে, যা দেশের বিদ্যুৎ খাতের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। অতিরিক্ত কাজের কারণে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রাহক সেবার মান আরও উন্নত হবে বলে আশা করছেন কর্মীরা।

নেপথ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও বঞ্চনা

জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে আরইবির বিরুদ্ধে নানা বৈষম্য আর বঞ্চনার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে সমিতির কর্মীদের। বিদ্যমান বৈষম্য দূর করতে সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ২০২৪ সালের শুরু থেকেই নিয়মতান্ত্রিকভাবে যৌক্তিক দাবি উপস্থাপন করে আসছেন। সংকট সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে একাধিকবার কমিটিও গঠন করা হয় এবং গঠিত কমিটি যাচাই-বাছাই শেষে ইতিবাচক সুপারিশ দেয়। কিন্তু তার সঠিক বাস্তবায়ন হয়নি।

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশও উপেক্ষিত

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আরইবির অনিয়ম-দুর্নীতি আর স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে চাকরি খুইয়েছেন অন্তত ৪৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। এদের মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে কঠিন কঠিন ধারায় মামলা দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ আইনি পথ পাড়ি দিয়ে এসব মিথ্যা মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন তারা। বিদ্যুৎ বিভাগও চাকরিচ্যুতদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু তা আমলে নিচ্ছে না আরইবি।

এতে সামাজিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবার চরম মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন।

অন্যদিকে, মন্ত্রণালয়কে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে আরইবির ৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশসহ বেশ কিছু নির্দেশনা কার্যকর করছে না আরইবি। নিজ মন্ত্রণালয়ের অধীনে থেকে তাদেরই নির্দেশনা একের পর না মানায় আরইবির প্রশাসনিক জবাবদিহি ও কর্তৃত্বের সীমা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

দেশের ৪ কোটি ৯৭ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহকের মধ্যে ৩ কোটি ৮০ লাখ গ্রাহক আরইবির। সংস্থাটি দেশজুড়ে ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। মূলত মাঠপর্যায়ে থেকে মূল কাজ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির প্রায় ৪৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। আর তদারকির দায়িত্ব পালন করে আরইবি।

সংস্থাটির বিরুদ্ধে নানা বঞ্চনাসহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ রয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মীদের। এমনকি আরইবির বিরুদ্ধে নিম্নমানের বৈদ্যুতিক মালামাল কেনাসহ নানারকম অনিয়ম-দুর্নীতিরও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। এসব নিয়ে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই দ্বন্দ্ব চলছে। প্রতিকার চেয়ে লিখিত আবেদন করেও মেলেনি কোনো সমাধান।

সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অভিন্ন চাকরি বিধিমালা প্রণয়ন, আরইবি ও সমিতির একীভূতকরণ এবং চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের চাকরি নিয়মিতকরণসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনে নামেন। যার মধ্যে দেশব্যাপী অবস্থান ধর্মঘট, মানববন্ধন ও গণছুটির মতো কর্মসূচিও ছিলো।

আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর ২০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিনা নোটিশে চাকরিচ্যুত করে আরইবি। পরদিন ঢাকায় ও কুমিল্লায় তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশসহ বিভিন্ন আইনে পৃথক তিনটি মামলা করে সংস্থাটি। এর বাইরে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয় ১৬০ জনকে। ওই ঘটনায় আন্দোলন জোরদার হলে বিভিন্ন সময়ে আরও ২৬ জনকে চাকরিচ্যুত করার পাশাপাশি চার হাজারেও বেশি কর্মীকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
এরপর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের দফায় দফায় বৈঠক এবং তাদের দাবি পর্যালোচনার আশ্বাসে বন্ধ হয় আন্দোলন। পর্যালোচনায় গঠিত হয় একাধিক কমিটি। এসব কমিটি বিভিন্ন সুপারিশ করলেও তার বেশিরভাগই কার্যকর না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক মোশাহিদা সুলতানা আগামীর সময়কে বলেছেন, পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির উপর আধিপত্য চর্চার সংস্কৃতি তৈরি করেছে আরইবি। তারা কর্মীদের অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করেছে। যেহেতু আদালত মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়েছে এবং মন্ত্রণালয়েরই নির্দেশনা রয়েছে, এখন এসব কর্মীদের ক্ষতিপূরণসহ চাকরিতে পুনর্বহাল করা উচিত আরইবির। কাজটা আরও আগেই করা দরকার ছিলো।

তার অভিযোগ, আরইবিতে বিভিন্ন গোষ্ঠী ও ব্যক্তির স্বার্থ জড়িত। যে কারণেই হয়তো মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

অভিযোগ উঠেছে, সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগের একাধিক স্পষ্ট নির্দেশনা ও বারবার তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও আরইবি রহস্যজনক কারণে তা এখনও বাস্তবায়ন করেনি। এতে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে তীব্র হতাশা ও গভীর অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে।

সূত্র: আগামীর সময়

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন
 

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ